August 24, 2026, 7:23 am
দেশের সার্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে অপ্রত্যাশিত ‘অস্বাভাবিকতা’ দেখা দিয়েছে। বড় ধরনের দীর্ঘস্থায়ী দুর্যোগ ও মহামারির সময় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক কিছুটা বেসামাল হয়ে পড়ে। কিন্তু সেটি সাময়িক। চলতি অর্থবছরসহ ২০২০ সাল থেকে দফায় দফায় করোনার আঘাতে অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে লকডাউন চলাকালে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ে মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসাবাণিজ্যসহ সবকিছু। কিন্তু যখন আমানত কমার কথা, তখন বেড়েছে; আবার যে সময়ে এসে আমানত বাড়ার কথা, তখন কমে যাচ্ছে। বিপরীতে বাড়ছে ঋণের চাহিদা। এছাড়া এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
সেটি হলো মহামারির সময় যে হারে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মানুষের হাতে রাখার কথা ছিল, সেটি হয়নি। তাহলে ওই সময় বেশির ভাগ মানুষ যে অর্থ খরচ করেছে তার একটি বড় অংশের উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সূত্রমতে, মহামারি করোনা সংক্রমণের পর থেকে এখন পর্যন্ত অর্থনীতির সূচকে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন হচ্ছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে গেছে। একই মাত্রায় বেড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহও। ওদিকে ব্যাংকবহির্ভূত মুদ্রার প্রবাহ কমে গিয়ে এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে। তবে কমে গেছে আমানতের প্রবৃদ্ধি, যা উদ্বেগজনক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘করোনা মহামারির কারণে শুরুতে সবকিছু স্থবির থাকায় অর্থনীতির সব সূচকেই নেতিবাচক চিত্র দেখা দেয়। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় সবকিছুতেই চাহিদা বাড়ছে। এ কারণে এখন সূচকগুলোও লাফিয়ে বাড়ছে। এর মধ্যে অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে। কিন্তু তদারকি রাখতে হবে যাতে কোনো নেতিবাচক দিকে এই উল্ফন ব্যবহৃত না হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সময়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ কমেছিল ৪৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ঋণ বেড়েছে ৮২ দশমিক ১৯ শতাংশ। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হলে ৭ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত হয়। কমে গেলে ১ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, করোনার কারণে গত অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা থাকায় ওই সময়ে ঋণের চাহিদা কম ছিল। যে কারণে হঠাৎ বেশি মাত্রায় কমে গিয়েছিল। এখন আবার হঠাৎই চাহিদা বাড়ছে। যে কারণে বেশিমাত্রায় ঋণ প্রবাহ বাড়ছে। প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে সরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমেছিল ৭০ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৫৯ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকারি বড় প্রকল্পের বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে এ খাতে ঋণ প্রবাহ হ্রাস-বৃদ্ধি হয়। করোনার কারণে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন কম হওয়ায় ঋণ প্রবাহ আগে কমেছে। এখন বড় প্রকল্পসহ সরকারি অন্যান্য বিনিয়োগ বাড়ায় এ খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এ খাতে ঋণ প্রবাহ ৮ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। কমার সময়ে সাধারণত ২ থেকে ১২ শতাংশ নেতিবাচক হয়। গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমেছিল ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৯২ দশমিক ০৫ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘করোনার কারণে ২০২০ সালে সবার মধ্যে আতঙ্ক ছিল। যে কারণে বেসরকারি খাত নতুন কোনো বিনিয়োগ করেনি। পণ্যের কেনাবেচাও কম ছিল, রপ্তানি ছিল স্থবির। চলতি অর্থবছর করোনার সংক্রমণ থাকলেও মানুষ আর ঘরে নেই। বেসরকারি খাতও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এজন্য ঋণের চাহিদা বেড়েছে। ’
গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে রাজস্ব আয় বেড়েছিল ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। আমদানি ব্যয় গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে কমেছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বেড়েছে সাড়ে ৫৪ শতাংশ।
ব্যাংকবহির্ভূত মুদ্রা গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে কমেছিল ৭৯১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়েছে ৮২ শতাংশ। ব্যাংকবহির্ভূত মুদ্রা কমে যাওয়ার কারণে টাকা ব্যাংকে এসেছিল। এখন আবার টাকা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণত দুর্যাগের সময় মানুষ অনিশ্চয়তায় পড়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখে। কিন্তু আমাদের এখানে এমনটি হয়নি। হয়েছে উলটো। এর কারণও খতিয়ে দেখা দরকার।’
এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মহামারির কারণে অর্থনীতির গতি যেভাবে থমকে গিয়েছিল, এখন আবার ঠিক সেভাবেই সচল হচ্ছে। এ কারণে হঠাৎ বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এটি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। তবে এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ব্যাপক তদারকি দরকার।’
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর-এই পাঁচ মাসে ব্যাংকিং খাতে আমানত বেড়েছিল ৫৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আগের বছরের তুলনায় কমেছে ৫১ দশমিক ৩১ শতাংশ। প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এখন আমানতের প্রবৃদ্ধি কমছে। বেশি বাড়ছে ঋণের প্রবৃদ্ধি। অথচ প্রচলিত নিয়মে ঋণের চেয়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি বাড়তে হয়।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষকরা বলেছেন, বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিপর্যয় বা মহামারির সময় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক যেভাবে অস্বাভাবিক আচরণ করে, এখন সেটিই ঘটছে। আবার মহামারি-পরপবর্তী সময়ে আফটার ইফেক্টের মতো কিছু সময়ের জন্য অস্বাভাবিক আচরণ বিদ্যমান থাকবে। এই অস্বাভাবিকতা ঠিক হতে কমপক্ষে ১/২ বছর সময় লাগবে। এ বিষয়ে যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক রয়েছে বলে দাবি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র।
প্রসঙ্গত, দেশে করোনার সংক্রমণের প্রভাব পড়তে শুরু করে ২০২০ সালের মার্চ থেকে। ওই মাসের শেষদিকে লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ে। একই বছর সেপ্টেম্বর থেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার বাড়তে থাকে। ২০২১ সালের মে থেকে আবার করোনার সংক্রমণ বাড়লে লকডাউনের ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফের বাধাগ্রস্ত হয়। সেপ্টেম্বরে গিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হতে শুরু করে। করোনা পরিস্থিতি আবার বাড়তে থাকায় জানুয়ারির শেষদিকে সীমিত আকারে কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়, যা এখনো চলমান রয়েছে। এসব কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির সূচকগুলোয়